কেন্দ্রীয় আয়ুষ এবং বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল কলকাতার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হোমিওপ্যাথির (এনআইএইচ) দক্ষতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন। আজ কলকাতায় এই প্রতিষ্ঠানের স্নাতক স্তরের ছাত্রদের জন্য একটি বহুতল ছাত্রাবাসের শিলান্যাস করার সময় তিনি এই ঘোষণা করেন। ২০২১ সালে এই ছাত্রাবাসটি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তিনি জানান। মন্ত্রী বলেন, এনআইএইচ-এ চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। বর্তমানে এখানে ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে যার শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করে ভবিষ্যতে ২৫০টি করার পরিকল্পনা আছে। মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচীর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এখানে একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এছাড়াও স্নাতকোত্তর স্তরে ছাত্র এবং ছাত্রীদের জন্য দুটি ছাত্রাবাস গড়ে তোলার কথাও তিনি বলেন। নতুন ছাত্রাবাসটি ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে। আজকের অনুষ্ঠানে আয়ুষ এবং নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মুন্জপারা মহেন্দ্রভাই এবং প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক অধ্যাপক ডাঃ সুভাষ সিং সহ আয়ুষ মন্ত্রকের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। ৮ তলার প্রস্তাবিত ছাত্রাবাসে ভবিষ্যতে আরও দুটি তলা যোগ করার সংস্থান থাকছে। এখানে স্নাতক স্তরের ৪০০ জন ছাত্র থাকতে পারবেন। এই ছাত্রাবাসে জিমনাসিয়াম, কমন রুম, গেস্ট রুম, রান্নাঘর, খাওয়ার জায়গা সহ সব ধরনের অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এর আগে ছাত্রীদের জন্য একটি আবাসের উদ্বোধনও করেছিলেন শ্রী সোনোওয়াল। এই উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, “ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হোমিওপ্যাথিতে ছাত্রদের সুবিধার্থে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বহুতল ছাত্রাবাসের শিলান্যাস করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীজির যোগ্য নেতৃত্বে পরম্পরাগত চিকিৎসা পদ্ধতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুস্থ ভারত গড়ে তোলার জন্য এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে আরও চিকিৎসক তৈরি করতে হবে। তাই আমি মনে করি এনআইএইচ-কে চিকিৎসার দিক থেকে একটি উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার সুবিধার জন্য আরও দেড়শোটি শয্যা বাড়ানো হবে। এছাড়াও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র যাতে এই ক্যাম্পাসে গড়ে তোলা যায় তার জন্য আমরা উদ্যোগী হয়েছি। স্নাতকোত্তর স্তরে ছাত্র ও ছাত্রীদের কথা বিবেচনা করে আমরা তাদের জন্যও ছাত্রাবাস তৈরি করবো। এছাড়াও এখানে ১৫০০ আসন বিশিষ্ট একটি প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলা হবে। এর মধ্য দিয়ে এনআইএইচ-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি হবে যার সুফল ছাত্রছাত্রীরা পাবেন। ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” শ্রী সোনোওয়াল আরও বলেন, “পরম্পরাগত ওষুধের ক্ষেত্রে এইআইএইচ একটি উৎকর্ষ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় আমি এই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত সকলকে অভিনন্দন জানাই। এখানে প্রতিদিন ২ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা করাতে আসেন। অর্থাৎ দেশের বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আপনাদের সকলকে এই প্রতিষ্ঠানের মান বজায় রাখতে হবে যাতে নাগরিকদের রোগ নিরাময়ে চিরায়ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সব থেকে বেশি কাজে লাগানো যায়। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থা ভারত বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো বাংলার মুনিষীরা এদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচলন করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও এই চিকিৎসা ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমাদের এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে হবে এবং দেশের মানুষের কাছে যাতে উন্নতমানের চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায় সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আয়ুষ পদ্ধতির চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর তাই দেশের মানুষের সুবিধার্থে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এটিকে যুক্ত করা হয়েছে।” কেন্দ্রীয় আয়ুষ এবং নারী ও শিশু বিকাশ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মহেন্দ্র ভাই বলেন, “হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ছাত্রছাত্রীদের জন্য কলকাতার এনআইএইচ অভূতপূর্ব এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠান দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, সৃজনশীল এবং গ্রহণযোগ্য একদল চিকিৎসক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা রয়েছে। অসুস্থ ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়া, রোগ প্রতিরোধের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং নতুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর জন্য এর প্রচুর সম্ভাবনা আছে। পশ্চিমবঙ্গকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার পথপ্রদর্শক বলে বিবেচনা করা হয়, আর সেই রাজ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে। এখানে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে মানোন্নয়ন ঘটানোর মধ্যে দিয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে রোগমুক্ত হবেন।” প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক অধ্যাপক ডাঃ সুভাষ সিং বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানের দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে- একটি কলকাতায় অন্যটি নতুন দিল্লিতে। প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তর স্তরে ৪৭ জন এবং স্নাতক স্তরে ১২৬ জন ভর্তি হয়। দিল্লি ক্যাম্পাসে ছাত্র ভর্তির কাজ চলছে। আয়ুষ মন্ত্রক কলকাতার এই কেন্দ্রটিকে ইন্টারমেডিয়ারি ফার্মাকোভিজিল্যান্স সেন্টার ফর হোমিওপ্যাথি হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখান থেকে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকরা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা দেশজুড়ে এই চিকিৎসা পদ্ধতির মানোন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এনআইএইচ-এর কলকাতা ক্যাম্পাস ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টি বহির্বিভাগ রয়েছে। কোভিড মহামারীর সময় এইসব কেন্দ্রগুলি চিকিৎসা পরিষেবা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এখানে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং সিজিএইচএস-এর তালিকাভুক্ত চিকিৎসকদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আয়ুষ মন্ত্রকের ন্যাশনাল মেডিকেল প্ল্যান্টেশন বোর্ডের সহযোগিতায় এনআইএইচ ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি ঔষধী গাছের বাগান গড়ে তুলছে। এনআইপিইআর-এর মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যৌথভাবে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসার গবেষণা জন্য এনআইএইচ একটি সমঝোতাপত্র সাক্ষর করবে। রায়পুরের এইমস-এর সঙ্গেও উন্নত চিকিৎসা এবং গবেষণার জন্যও আর একটি সমঝোতাপত্র সাক্ষর করা হবে।” কলকাতার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের আওতায় ১৯৭৫ সালের ১০ ডিসেম্বর একটি সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি তার যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান আয়ুষ মন্ত্রকের আওতাধীন। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত এনআইএইচ-এ ১৯৮৭ সাল স্নাতক স্তরের পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। স্নাতকোত্তর স্তরে ৬টি বিষয়েও এখানে পড়ানো হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে যেখানে রোগ নিরাময়ের জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। কলকাতার সল্টলেকের সেক্টর থ্রি-এর জিই ব্লকে ১৬ একর জমির ওপর এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়াও জেসি ব্লকে ৯ একর জমিতে কর্মীদের একটি আবাসন রয়েছে।