কিডনির নানান ধর নের রোগের লক্ষণ আলাদা আলাদা হয় , যার মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি প্রধানত দেখা যায়: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে চোখ ফুলে যাওয়া। মখ এবং পা ফুলে যাওয়া। ক্ষুধামান্দ্য , বমি ভাব , দুর্বল ভাব। বার বার প্রস্রাবের বেগ , বিশেষ করে রাত্রে। কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ শারীরিক দুর্বল ভাব , রক্ত ফ্যাকাসে হওয়া। অল্প হাঁটার পরে, নি শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা তাড়াতাড়ি ক্লাস্তি অনুভব করা। ৬ বছর বয়সের পরেও রাত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা। প্রস্রাব কম আসা । প্রস্রাব করার সময় জুলন অনুভব করা এবং প্রস্রাবে রক্ত বা পুজ-এর উপস্থিতি। প্রস্রাব করার সময় কষ্ট হওয়া। ফোটা ফোটা করে প্রস্রাব হওয়া। পেটের মধ্যে গিট হওয়া , পা আর কোমরের যন্ত্রণা। উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনও একটি লক্ষণের উপস্থিতি থাকলে কিডনির রোগের সম্ভাবনা থাকতে পারে , এবং তৎক্ষণাৎ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে চেক-আপ করানো দরকার। কিডনির রোগের নির্ণয় কিডনির অনেক রোগ-চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। জটিল কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। দুর্ভাগ্যবশত অনেক গভীর কিডনির রোগের লক্ষণ শুরুতে কম দেখা যায়। এইজন্য যখনই কিডনির রোগের আশঙ্কা হয়, তখনই বিনা বিলম্বে ডাক্তারবাবর সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করা দরকার। কিডনির পরীক্ষা কাদের করানোর দরকার? কিডনির রোগের সম্ভাবনা অধিক কখন ? ১. যে ব্যক্তির কিডনির রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২. ডায়াবিটস (মধুমেহ) রোগগ্রস্ত ব্যক্তি। ৩. উচ্চ-রক্তচাপযুক্ত ব্যক্তি (High Blood Pressure) ৪. পরিবারে বংশানুগতিক কিডনি রোগের ইতিহাস। ৫. অনেক দিন ধরে যন্ত্রণা নিবারক (Pain Killer Tablets) ঔষধের সেবন। ৬. রেচনতন্ত্রে জন্মগত রোগ ৭. ২-৫ বৎসর অন্তর নিয়মিত পরীক্ষা সাধারণের জন্য দরকার। কিডনির রোগের নির্ণয়ের জন্য আবশ্যক পরীক্ষাগুলি হল প্রস্রাবের পরীক্ষা কিডনি রোগের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রস্রাব পরীক্ষা অতি প্রয়োজনীয়— • প্রস্রাবের পুজের (Pus) উপস্থিতি মূত্রনালিতে সংক্রমণের নিদর্শন। • প্রস্রাবের প্রোটিন বা রক্তকণিকার উপস্থিতি গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস এর নিদর্শন। মাইক্রোঅ্যালবুমিনেবিয়া প্রস্রাবের এই পরীক্ষাটি ডায়াবিটিসের কারণে কিডনি খারাপ হবার সম্ভাবনা থেকে সর্বপ্রথম এবং সবথেকে তাড়াতাড়ি নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রস্রাবের অন্য পরীক্ষাগুলি হল (১) প্রস্রাবের টি.বি.র জীবাণুর (Bacteria) পরীক্ষা টি.বি. নির্ণয়ের জন্য। (২) ২৪ ঘণ্টার মূত্রে প্রোটিনের মাত্রা (কিডনির ফোলাভাব আর তার চিকিৎসার প্রভাব জানার জন্য) (৩) প্রস্রাব কালচার আর সেনসিটিভিটি পরীক্ষা (প্রস্রাব সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটিরিয়া বিষয়ে জানতে আর তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যাপারে জানতে) প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির বিভিন্ন রোগের ব্যাপার জানা যায় কিন্তু প্রস্রাব পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক (Normal) হওয়া সত্ত্বেও কডনিতে কোনও রোগ নেই সেটা বলা যায় না। রক্তের পরীক্ষা নিরীক্ষা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি (রক্তাল্পতা অ্যানিমিয়া) কিডনি ফেল হবার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। রক্তাল্পতা শরীরের অন্য কোনও রোগের নিদর্শনও হতে পারে সেজন্য এই পরীক্ষা সর্বদা কিডনির রোগের জন্যই করা হয় এমন নয়। রক্তে ক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়ার মাত্রা এই পরীক্ষা কিডনির কার্যদক্ষতার পরীক্ষা। ক্রিয়েটিনিন আর ইউরিয়া হল শরীরের অনাবশ্যক বর্জ্য পদার্থ, কিডনির দ্বারা শরীরের বাইরে নিষ্কাশিত হয়। শরীরের ক্রিয়েটিনিন এর ধারাণ মাত্রা ০.৬ থেকে ১.৪ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার আর ইউরিয়ার সাধারণ ত্ৰা ২০ থেকে ৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। কিডনিযুগল বিকল হলে দুটিরই ত্ৰা বাড়ে। এই পরীক্ষাটিও কিডনি রোগের নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা কিডনির বিভিন্ন রোগের নির্ণয়ের জন্য রক্তের অন্যান্য পরীক্ষাগুলি হল কোলেস্টোল, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম, ফসফেটস, কমপ্লিমেন্টস ইত্যাদি। রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা কিডনির সোনোগ্রাফি এটি একটি সরল, সুরক্ষিত, শীঘ্র পদ্ধতি যার দ্বারা কিডনির র, অবস্থান, মূত্রমাগের অবরোধ, পাথর (Stone) ইত্যাদি ব্যাপারে জানা যায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ক্রনিক কিডনি ফেলিওর-হলে রোগীর কিডনির সংকোচন এই পরীক্ষার দ্বারা বোঝা যায়। কিডনির Size ছোট হয়ে যায়।) পেটের এক্স-রে এই পরীক্ষা মুখ্যত কিডনির স্টোন নির্ণয়ের জন্য করা হয়। ইন্ট্রাভেনাস পাইলোগ্রাফি (আইভিপি) এই পরীক্ষাতে রোগীকে এক বিশেষ ধরনের আয়োডিনযুক্ত (রেডিও কনট্রাস্ট পদার্থ) ঔষধের ইনজেকশন দেওয়া হয়। ইনজেকশন দেবার পরে অল্প অল্প সময়ের অন্তরালে পেটের (X-Ray) নেওয়া হয়। এই (X-Ray) তে ঔষধ কিডনির মধ্য দিয়ে মূত্রনালিকা দ্বারা মূত্রাশয়ে জমা হতে দেখা যায়। আইভিপির দ্বারা কিডনির কার্যক্ষমতা আর মূত্রনালিকার অবস্থানে ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়। এই পরীক্ষা বিশেষ করে স্টোন, মূত্রনালিতে অবরোধ (obstacle) গীট-এর নির্ণয় করা যায়। যখন কিডনি খারাপ হবার পরে কম কাজ করে তখন এই পরীক্ষা কার্যকরী হয় না। রেডিও কনট্রাস্ট ইনজেকশন খারাপ কিডনিকে আরও খারাপ করতে পারে। এই কারণে কিডনি বিকল রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা ক্ষতিকারক হতে পারে। আই.ভি.পি একটি X-Ray পরীক্ষা হবার কারণ, গর্ভাবস্থায় থাকা বাচ্চার জন্য হানিকারক হতে পারে। সেজন্য গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা হয় না অন্য রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা কিছু বিশেষ প্রকার কিডনির রোগের জন্য ডপলার, মিক্সইউরেটিং সিস্টোইরেথ্রোগ্রাম রেডিও নিউক্লিয়ার স্টাডি, রেনাল অ্যানজিওগ্রাফি, সি. টি. স্ক্যান, অ্যানটিগ্রেড আর রেট্রোগ্রেড পাইলোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা হয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কিডনি বায়োপসি , দূরবিন দ্বারা মূত্রনালিকার পরীক্ষা , এবং ইউরোডাইনামিক্সের মতো বিশেষ প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চডনির অনেক প্রকার রোগের নির্ণয়ের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। সূত্র: কিডনি এডুকেশন ফাউন্ডেশন