সূর্য থেকে যে শক্তি পাওয়া যায় তাকে সৌরশক্তি বলে। পৃথিবীতে যত শক্তি আছে তা সূর্য কিরন ব্যবহার করেই তৈরি হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তেল ইত্যাদি আসলে বহু দিনের সঞ্চিত সৌরশক্তি। সৌরকোষ আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে সৌরকোষ। সৌরকোষের বৈশিষ্ট্য হল এতে সূর্যের আলো পড়লে এ থেকে সরাসরি তড়িৎ পাওয়া যায়। সৌরশক্তির ব্যবহার লেন্সের সাহায্যে সূর্যের আলোকে অভিসারী করে আগুন লাগানো যায় । সূর্যের আলোকে ধাতব পাতের সাহায্যে প্রতিফলিত করে সৌরচুল্লীতে রান্না করা যায় । শীতের দেশে ঘরবাড়ি গরম করার কাজে ব্যবহার হয় । মাছ, শস্য, সবজি শুঁকানোর কাজে সৌরশক্তি ব্যবহৃত হয় । সৌর শক্তির আরও উদাহরণ হচ্ছে সোলার ওয়াটার হিটার, সোলার কুকার ইত্যাদি । বিস্তারিত সৌর লন্ঠন সৌর লণ্ঠন সৌর ফটোভোলটাইক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নির্মিত একটি সহজে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্র যা গ্রামে, বিশেষ করে যেখানে বিদ্যুৎ সহজলভ্য নয় সেখানে কাজে লাগানো যায়। এমনকী শহুরে অঞ্চলেও বিদ্যুৎ না থাকার সময় এটিকে ব্যবহার করা যায়। কী ভাবে সৌর লণ্ঠন কাজ করে সৌর লণ্ঠনের তিনটি অংশ - সৌর পিভি প্যানেল, স্টোরেজ ব্যাটারি এবং আলো। প্রক্রিয়াটি খুব সহজ। এসপিভি প্যানেলের সাহায্যে সৌরশক্তি বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং তা রক্ষণাবেক্ষণের তেমন প্রয়োজন হয় না এমন একটি ব্যাটারির মধ্যে জমা রাখা হয় যাতে প্রয়োজন মতো রাতে তা ব্যবহার করা যায়। একবার চার্জ দিলে চার-পাঁচ ঘণ্টা এই ধরনের লণ্ঠন থেকে আলো পাওয়া যেতে পারে। সৌর পাতনযন্ত্র লোনা জলের অঞ্চলে যারা থাকেন তাঁদের, বিশেষ করে মহিলাদের পক্ষে পানীয় জল সংগ্রহ করা এবং তা পানযোগ্য করার জন্য শোধন করা খুবই দুরূহ। ওয়াটার স্টিল লবণাক্ত জল সৌররশ্মির সাহায্যে পরিশুদ্ধ করে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি একটি সহজ ও কম খরচের নমুনা হল এই সৌর পাতনযন্ত্র। সৌর পাতনযন্ত্রের নির্মাণ সূর্য যে ভাবে সমুদ্রের জলকে বাষ্পীভূত করে ও তাকে ফের বৃষ্টির জলে পরিণত করে সেই বাষ্পীভবন-ঘনীভবন তত্ত্বই সোলার স্টিলের প্রযুক্তির মূলে। লবণাক্ত জল একটি ট্যাঙ্কে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে সেই জল সরাসরি সূর্যের সংস্পর্শে আসে। ট্যাঙ্কের তলদেশ কালো রঙের হওয়ার দরুন সূর্যের তাপ শুষে নিয়ে গরম হয়ে যায়। এর ফলে জল বাষ্পীভূত হয়। সেই জল উপরের একটি কাচের চাদরে জমা হয় এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলে পরিণত হয়। পরে একটি কলের সাহায্যে সেই পরিশুদ্ধ জল বের করে এনে পরবর্তী ব্যবহারের জন্য জমা করে রাখা হয়। প্রতি বর্গমিটার জায়গায় দিনে এই পদ্ধতিতে দু’-তিন লিটার পরিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া যায়। সৌরশক্তি চালিত বহনযোগ্য ঘরোয়া ব্র্যাকিশ ওয়াটার রিভার্স ওসমোসিস কারিগরি এই কারিগরীর উদ্ভাবন করেছে ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র বা বিএআরসি। এটি ব্যটারিবিহীন সৌর ফটোভোলটাইক পদ্ধতির সাহায্যে কাজ করে। একে গ্রিডে সংযুক্ত করা যায় না। এটির ক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় দশ লিটার লবণমুক্ত পানীয় জল তৈরি করা। এটি ১০০০ থেকে ৩০০০ পিপিএম (প্রতি লিটারে মিলিগ্রাম) লবণাক্ত জল পরিশুদ্ধ করে ৫০ থেকে ৩০০ পিপিএম (প্রতি লিটারে মিলিগ্রাম) পরিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করতে পারে। এই জলের মধ্যে কোনও বিষাক্ত পদার্থ, জীবাণু, কাদা থাকে না। এই প্রক্রিয়ায় চাপ দ্বারা চালিত ছাকনিযুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যার নাম রিভার্স ওসমোসিস। এর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সৌরশক্তি চালিত পিভি পদ্ধতির মাধ্যমে। এই কারিগরী বিদ্যা সেইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপযোগী যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি বা ভোল্টেজ ঠিকমতো পাওয়া যায় না। শহুরে এলাকাতেও একে ব্যবহার করা যায়। যে হেতু এটি বহনযোগ্য কারিগরী ব্যবস্থা, তাই মরুভূমি এলাকায় এটি খুবই কার্যক। বিশেষ করে মরুভূমি এলাকায় যে সব প্রতিরক্ষা কর্মী কাজ করছেন তাঁরা এই পদ্ধতিতে পানীয় জল সংগ্রহ করতে পারেন। সোলার কুকার সৌর শক্তি পরিচালিত কুকারের সাহায্যে গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার করা হয় । সোলার কুকারের সুবিধা ও অসুবিধা সুবিধা এতে রান্নার গ্যাস, কেরোসিন, বিদ্যুৎ, কয়লা বা কাঠ লাগে না। সৌরশক্তি নিখরচায় পাওয়া যায় ফলে জ্বালানির জন্য খরচ করতে হয় না। সৌর কুকারে রান্না করা খাবার পুষ্টিকর। প্রথাগত পদ্ধতির বদলে সৌর কুকারে রান্না করলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি প্রোটিন খাবারের মধ্যে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। ভিটামিন থিয়ামিন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি রেখে দেওয়া যায়। সৌর কুকারে রান্না করলে খাবারে ভিটামিন এ ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেশি সংরক্ষিত হয়। সৌর কুকার নিরাপদ ও দূষণমুক্ত। বিভিন্ন মাপের সৌর কুকার পাওয়া যায়। পরিবারে কত জন সদস্য রয়েছেন সেই হিসাব করে সোলার কুকার কেনা যেতে পারে। সৌর কুকারে সব ধরনের রান্না করা সম্ভব (যেমন সিদ্ধ করা বা রোস্ট করা ইত্যাদি)। সৌর কুকার কেনার ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্প রয়েছে যেখানে ভর্তুকি পাওয়া যায়। অসুবিধা সৌর কুকারে রান্না করতে গেলে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো প্রয়োজন। সাধারণ পদ্ধতিতে রান্না করার চেয়ে সৌর কুকারে রান্না করলে অনেক বেশি সময় লাগে। সোলার কুকারের ধরন সোলার কুকার মূলত দুই ধরনের হয় । বক্স টাইপ সোলার কুকারঃ এটি একটি গরম বাক্সের মতো যার মধ্যে খাবার রান্না করা হয়। বাড়িতে রান্নার জন্য এ ধরেনর কুকারই ব্যবহার করা হয়। বক্স টাইপ সোলার কুকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আউটার বক্স - সোলার কুকারের বাইরের বাক্সটা সাধারণত জিআই অথবা অ্যালমুনিয়াম চাদর অথবা ফাইবার রিইনফোরসড কংক্রিট দিয়ে তৈরি। ইনার কুকিং বক্স ( ট্রে ) - সোলার কুকিং বাক্সের ভিতরটা অ্যালমুনিয়াম চাদরের তৈরি। বক্সের বাইরের তুলনায় আয়তনে ভিতরটি ছোট। এর গায়ে কালো রঙ করা থাকে যাতে সহজেই সূর্য থেকে তাপ শুষে নিতে পারে এবং উৎপাদিত তাপ রান্নার পাত্রে চালান করতে পারে। ডাবল গ্যাস লিড - ইনার বক্স বা ভিতরের বাক্সে দু’টি কাচের তৈরি ঢাকনা থাকে। ভিতরের বাক্সের তুলনায় আয়তনে তা একটু বড় হয়। ২ সেন্টিমিটার ব্যবধানে কাচ দু’টি একটি অ্যালমুনিয়াম ফ্রেমের গায়ে আটকানো থাকে। ফাঁকা জায়গাটিতে বাতাস থাকে যাতে ভিতরের তাপ বাইরে যেতে না পারে। ফ্রেমের ধার বরাবর একটি রাবারের স্ট্রিপ লাগানো থাকে যাতে কোনও ভাবেই তাপ বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। থার্মাল ইনসুলেটর - ইনার ট্রে বা বাক্স এবং বাইরে বাক্সের মধ্যের জায়গায় তাপ নিরোধক গ্লাসউল বা ইনার ট্রে বা বাক্স এবং বাইরে বাক্সের মধ্যের জায়গায় তাপ নিরোধক গ্লাসউল কাচতন্তু দেওয়া থাকে। এর ফলে কুকার থেকে তাপ নিঃসরণ হয় না। ওই তাপ নিরোধক পদার্থ যেন সব রকম উদ্বায়ী পদার্থ মুক্ত হয়। আয়না - তাপ শুষে নেওয়ার জায়গায় বিকিরণের পরিমাণ বাড়াতে আয়না ব্যবহার করা হয়। মূল ঢাকার ভিতরের দিকে আয়নাটি লাগানো হয়। সূর্যের আলো আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ডাবল গ্যাস লিড মধ্য দিয়ে ভিতরের ট্রেতে পৌঁছয়। এতে বক্সের মধ্যে পৌঁছনো বিকিরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং কুকারের ভিতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রান্নার গতি বাড়ায়। পাত্র - রান্নার জন্য ব্যবহৃত পাত্রগুলি সচরাচর অ্যালমুনিয়াম বা স্টেনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি হয়। এই পাত্রগুলির বাইরেটাও কালো রঙের হয় যাতে সরাসরি সূর্য থেকে তাপ টেনে নিতে সক্ষম হয়। বক্স টাইপ সোলার কুকারে রান্নার পদ্ধতি কোনও ছায়া যাতে না লাগে সেই রকম জায়গায় সূর্যের আলোয় কুকারটি রাখতে হবে। এর ভিতরে কুকিং পট ঢোকানোর আগে অন্তত ৪৫ মিনিট এটিকে সূর্যের তাপে রেখে দিতে হবে। এর ফলে রান্নার সময় খানিকটা বাঁচে। এমন ভাবে কুকারটি বসান যাতে সূর্যের আলো সরাসরি আয়নার উপর পড়ে এবং তা প্রতিফলিত হয়ে স্বচ্ছ কাচের ঢাকনার উপর যায়। এই অবস্থাতেই আয়নার কবজাগুলো টাইট করতে হবে। সোলার কুকারের কাচের ঢাকনা খুলুন, ভিতরে রান্নার পাত্রগুলি বসান এবং ঢাকনাটি ঠিকমতো বন্ধ করুন। রান্নার পাত্রগুলি এক বাড় বসিয়ে দিলে ঢাকনাটি আর খুলবেন না। রান্না হয়ে গেলে কাচের ঢাকনাটি খুলুন। পাত্রগুলি খুব গরম থাকে বলে কাপড়ের ন্যাপকিন জড়িয়ে সেগুলো বাইরে বের করে আনুন। বক্স ধরনের সোলার কুকারের দাম এর দাম ২৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। দাম নির্ভর করে সাইজ ও মডেলের উপর। কনসেনট্রেটর টাইপ সোলার কুকার প্রতিফলক প্যারাবলিক সোলার কনসেনট্রেটরের মাধ্যমে সৌরশক্তি কেন্দ্রীভূত করার নীতির ভিত্তিতেই এই কুকার কাজ করে। যেখানে রান্নার বাসন রাখা থাকে সেই জায়গায় সূর্যের বিকিরণ প্রতিফলক প্যারাবলিক সোলার কনসেনট্রেটরের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত করা হয়। কনসেনট্রেটর টাইপ সোলার কুকারের বিভিন্ন অংশ সোলার কনসেনট্রেটিং ডিস্ক (প্রাথমিক প্রতিফলক)- এই ডিস্ক বা চাকতিটি সৌরশক্তিকে একটি ফোকাল পয়েন্টে কেন্দ্রীভূত করে। অটোমেটিক ট্র্যাকিং সিস্টেম- খুবই সহজ যান্ত্রিক ট্র্যাকিং পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যবহারে সূর্যের দিকে সোলার কনসেনট্রেটিং ডিস্কটি ঘোরে। এর ফলে সব সময় ধারাবাহিক ভাবে কেন্দ্রীভূত সৌরশক্তি পাওয়া সম্ভব হয়। দ্বিতীয় প্রতিফলক - এটি রান্নার জায়গা বা রান্নাঘরের উত্তরমুখী দেওয়ালে রান্নার বাসনের ঠিক নীচে বসানো হয়। এটি কেন্দ্রীভূত সৌররশ্মিকে প্রতিফলিত করে রান্নার বাসনের ঠিক নীচে পাঠায়। রান্নার বাসন। কনসেনট্রেটর টাইপ সোলার কুকারে রান্নার পদ্ধতি সোলার ডিস্ক খোলামেলা ছায়াবিহীন জায়গায় বসানো হয়। বা কোনও ছাদের উপর দক্ষিণ দিকে মুখ করে এটিকে বসানো হয়। মাটির একই স্তরে রান্নার জায়গা এবং বাসন উত্তরমুখী করে বসানো হয়। ডিস্ক থেকে প্রতিফলিত রশ্মি উত্তরদিকের দেওয়ালে বসানো দ্বিতীয় প্রতিফলক । সোলার কুকারের কার্যকারিতা প্রতি দিন সকালে চাকতিটিকে পূর্বে সূর্যের দিকে মুখ করে বসাতে হয় যাতে সকালের সূর্যালোক ঠিকমতো পায়। সূর্যঘড়ির সঙ্গে লাগানো যন্ত্রটি সূর্যের অভিমুখ অনুযায়ী আপনাআপনি ঘুরে সঠিক অবস্থানে চলে আসে। রান্নার বাসন বা সামগ্রীর উপর কেন্দ্রীভূত সূর্যের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রান্না শুরু হয়ে যায়। প্রাথমিক বড় চাকতিটি থেকে প্রতিফলিত কেন্দ্রীভূত সৌরালোক রান্নার সামগ্রীর নীচে রাখা দ্বিতীয় চাকতিটির উপর এসে পড়ে। দ্বিতীয় প্রতিফলক সৌরশক্তিকে রান্নার বাসনের ঠিক নীচে পাঠায় এবং সেই তাপে রান্না হতে থাকে। ঋতু অনুযায়ী চাকতিটিকে প্রতি ছ’মাস অন্তর সঠিক জায়গায় বসাতে হবে কারণ পৃথিবীর অক্ষের পরিপ্রেক্ষিতে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন হয়। দাম এই ধরনের কুকারের দাম ৭ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। সাইজ ও মডেলের উপর দাম অনেকটাই নির্ভর করে। সংশ্লিষ্ট সুত্র Technical Specifications for Compact Fluorescent Lamp (CFL) based solar photovoltaic lighting systems including solar lanterns Technical Specifications for White LED (W-LED) based solar photovoltaic lighting systems including solar lanterns Specifications for WHITE LED BASED SOLAR LANTERN SYSTEM Central Salt and Marine Chemicals Research Institute (CSMCRI), Gijubhai Badekar Marg, Bhavnagar- 364 002, Gujarat